আমি গত বছরের শেষ দিকে বেশ কিছু ইন্টারভিউ দিই চাকরির জন্য। ফেসবুক গ্রুপ বা ফ্রেন্ড সার্কেল থেকে খোঁজখবর নিয়ে নিয়মিত সিভি সাবমিট করতাম তখন। প্রথমদিকে বেশ র‍্যান্ডম আর শেষে বেছে বেছে কয়েকটা কোম্পানিতে এপ্লাই করি। অধিকাংশ ব্যাকেন্ড বা মেশিন লার্নিং রিলেটেড। বাংলাদেশে মেশিন লার্নিং এখনো একটা আজাইরা টার্ম মাত্র। যেসব কোম্পানিতে আমি এপ্লাই করছি প্রায় সবগুলাতেই ইন্টারভিউ ডাক পাইছিলাম। তো যেহেতু এপ্লাই একা একাই সামলাইতে হইছে এবং কিভাবে কি করব কোন ধারণা ছিলোনা বলে ব্যাপারটা বেশ পরিশ্রমসাধ্য ছিল। সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে এনএসটিইউ গ্রাজুয়েটদের নাজুক অবস্থার জন্য এই চাকরি জোগান যাত্রা খানিকটা কঠিন বলা যায়। তো আমার নড়বড়ে যোগ্যতা নিয়ে মোটামুটি একটা চাকরির সন্ধান করতে গিয়ে যা কিছু করতে হইছে তার খানিক বয়ান এখানে লেইখা রাখতেছি। ক্যাম্পাসের জুনিয়রদের কাজে লাগতে পারে।

আমি প্রথম ইন্টারভিউ দিই ৪-১ টার্মের শেষ দিকে (জুলাই ২০১৮) । একটা মেশিন লার্নিং বেইজড স্টার্টআপে। প্রথমে লিখিত পরীক্ষা তারপরে ইন্টারভিউ। ওখানে লিখিত পরীক্ষাটা বেশ কঠিন ছিল আর তাতেই আশা হারাইতে হইল। অবশ্য এইচআর ইন্টারভিউ ভালো হইছিল। রিজেক্ট খাইলাম। তারপরে এক বন্ধুর খোঁজে একটা ফার্মে ইন্টারভিউ দিতে গেছিলাম অগাস্টের দিকে। ইন্টারভিউ আর অফিস এনভায়রনমেন্ট দেখেই বুঝছি এরা অথর্ব কোম্পানি। এরপরে বেশ গোছালোভাবে অগাস্ট থেকে ডিসেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত বেশ কিছু কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দিই। বাংলাদেশে ফ্রেশারদের ভালো সুবিধা দেয় এবং ভালো কাজ করার সুযোগ আছে এমন কোম্পানি সংখ্যায় কম। যেসব সফটওয়্যার ফার্মে ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলাম ওরা সবাই ফ্রেশার নিতে আগ্রহী ছিলো। আমার এই স্বল্প অভিজ্ঞতায় আমি যা বুঝতে পারছি যে কম্পিটিটিভ প্রোগ্রামিং এই সময়ে বেশ জনপ্রিয়। রিক্রুটাররা কম্পিটিটিভ প্রোগ্রামিং প্রোফাইল বিবেচনায় নিয়ে নির্ভয়ে ফ্রেশার রিক্রুট করতে চায়। ভালো স্যালারি দিচ্ছে আর কাজের পরিবেশও ভালো বলা যায়। প্রাথমিকভাবে মেইল করে বা কোম্পানির সাইটে সিভি সাবমিশনসহ ইন্টারভিউয়ের ধাপ বিভিন্ন কোম্পানিতে বিভিন্ন রকম। কেউ ২ ধাপে, কেউ ৩ ধাপে, কেউ কেউ ৪/৫ ধাপেও রিক্রুটমেন্ট প্রসেস সম্পূর্ণ করে থাকে। সকল যোগাযোগ বা খোঁজখবর যা করার সবই ই-মেইলে হয়ে থাকে। প্রাথমিক সিভি সর্টিং শেষে ১ টা রিটেন / কোড টেস্ট হয়, তারপর সর্টলিস্টেড হলে সেখান থেকে টেকনিক্যাল + এইচআর ইন্টারভিউ। এই দুই ধাপে মোটামুটি ভালো করতে পারলে অফার নিশ্চিত। এরপর স্যালারি নিয়ে আলাপ আর রিক্রুটমেন্টের অফিশিয়াল কিছু প্রসেস থাকে।

চাকরির এপ্লাইয়ে উৎরানোর জন্য সবার আগের ব্যাপার হলো ইনিশিয়াল সর্টিংয়ে নিজের সিভি টেকানো, মানে একটা চাকরির জন্য সিভি মেইল করার পর পরবর্তী ধাপে ডাক পাওয়া। এটার জন্য ভালো সিভি লিখতে পারাটা জরুরি। কিভাবে ভালো সিভি লিখতে হয় এ নিয়ে গুগল করলে জানা যাবে। এই কষ্টটুকু অনেকেই করতে চায় না বইলা সিভি রিজেক্ট খায়। আর আমাদের ক্যাম্পাসে যেহেতু ক্যারিয়ার নিয়ে ন্যূনতম জ্ঞানও দেয়া হয় না আমাদের জন্য ব্যাপারটা খুবই মারাত্মক। ভালো সিভি কেমন হতে পারে? ভালো সিভি হবে সিম্পল – রঙঢঙ্গের বালাই থাকবে না। পড়া যায় এমন দুয়েকটা ফন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে আর এক রঙা (কালো)। দৈর্ঘ্য হবে ১ বা বড় জোর ২ পাতার। এডুকেশন, এক্সপেরিয়েন্স, প্রজেক্ট, এচিভমেন্ট বা এওয়ার্ড, কো-কারিকুলার, টেকনিক্যাল টুলস এগুলো নিয়ে কম কথায় জরুরি পয়েন্টগুলো নিয়ে সিভি লিখতে হবে। লেখার আগে গুগল করে দুয়েকটা ফরম্যাট দেখে নিলে ভালো হয়। আমি ওভারলিফের ল্যাটেক্স ফরম্যাট ব্যবহার করছিলাম। সিভি দেখে যেন ৩০ সেকেন্ডে তথ্য চোখ দিয়ে টেনে ফেলা যায় এমন হতে হবে। অগুরুত্বপূর্ণ বা সফটওয়্যার প্রকৌশলের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ তথ্য সিভিতে এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। যে প্রজেক্ট কপি পেস্ট করে করা সেটার কথা না লেখাই ভালো। এবং অবশ্যই মিথ্যা কথা না বলা বা একজাগারেশন না করা।

একটা ভালো সিভি লিখতে পারলে পরের ধাপে নিশ্চিত ডাক পড়বে। সহজ করে বললে ACM সংশ্লিষ্ট মোটামুটি একটা প্রোফাইল থাকলেই ফ্রেশার হিশেবে ডাক মিলবে। তো রিটেন টেস্ট বা কোড টেস্টে কি থাকে? এখানে আমার অভিজ্ঞতায় আমি তিনটা বিষয় পাইছি – ১/ প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ + ডাটা স্ট্রাকচার ও এলগরিদম ২/ অবজেক্ট অরিয়েন্টেড প্রোগ্রামিং ৩/ অপারেটিং সিস্টেম ও ওয়েব প্রোগ্রামিং। এই তিন বিষয়ে মোটামুটি ধারণা থাকতে হবে। প্রোগ্রামিংয়ের জন্য কোডফোর্সেস ডিভ ২ এর A, B এবং C সলভ করার সক্ষমতাই যথেষ্ট। ব্লুকোডার পর্যন্ত যেতে পারলেই ইন্টারভিউ টপকানো ব্যাপার না।

ভালো সফটওয়ার ফার্ম অনেক সময় রেগুলার রিক্রুমেন্টের মধ্যে গিয়ে হাজার হাজার সিভি নিয়ে ডিল করতে চায় না। এজন্য রিক্রুটমেন্ট হয় ইন্টারনাল লিঙ্কে। আমাদের গ্রাজুয়েটদের সফটওয়্যার ইন্ড্রাস্টিতে নাজুক অবস্থার জন্য আমরা এই জায়গায় পিছিয়ে থাকি। এক্ষেত্রে বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু বা বড়ভাইয়ের যোগাযোগ ব্যবহার করে সিভি সাবমিট করতে হতে পারে অনেক সময়। আর ফেসবুকের এই গ্রুপে নিয়মিত নতুন চাকরির খবর পাওয়া যায়।

আমাদের দেশে শয়ে শয়ে আউটসোর্সিং বেইজড ফার্মের জন্য ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা ভালো না। ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে আমি খুব একটা এই মুহুর্তে বলতে পারছি না। তবে অধিকাংশ কোম্পানিতে একজন এইচআর রাখার সামর্থ্য নাই হয়ত। দেখা যাবে এপ্লাই করার পর একটা কার্টেসি মেইল পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না। কোম্পানির সিইও সরাসরি রিক্রুট করছে টাইপ অবস্থা। তাই অধিকাংশ কোম্পানিতে ফ্রেশারদের স্যালারি অফার করতে পারে ২০-৩০ হাজার। ভালো কোম্পানিতে অবশ্য স্যালারি রেঞ্জ ৪০-৬০ হাজার আনুমানিক। হরদরের ফার্মগুলিতে কর্মঘন্টাও অনেক বেশি। সাধারণত সপ্তাহে ৪০ ঘন্টা কর্মঘন্টা হলো স্ট্যান্ডার্ড। মানে দুদিন ছুটি আর বাকি পাঁচদিনে ৮ ঘন্টা করে অফিসে কাজ করতে হয়। ফ্রেশারদের ৩ মাস বা ৬ মাসের প্রভেশন পিরিয়ড থাকে। ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে বিস্তারিত এ মুহুর্তে লেখা সম্ভব না কেননা আমি নিজে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানিনা/বুঝিনা এখনও।

সব মিলিয়ে এই কয়েকটা কি পয়েন্ট জরুরি –

  • কম্পিটিটিভ প্রোগ্রামিং
  • ভালো প্রজেক্ট
  • ভালো সিভি/ রিজিউমি
  • ইন্টারনাল লিঙ্ক
  • অনেক বেশি এপ্লাই করা
  • সঠিক ম্যাচের অপেক্ষা করা

আমি সব মিলিয়ে ৭/৮ টা কোম্পানিতে ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম। প্রথমদিকে কোন ফার্ম থেকেই অফার পাইনি। ১৮’র ডিসেম্বরের শেষ আর ১৯’র শুরুতে ৩ টা ফার্ম থেকে অফার পাই (স্যামসাং আর এন্ড ডি, একটা বাংলাদেশি স্টার্টআপ আর সুইডিশ স্টার্টআপ গোয়াবা)। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শেষ দিকে আমি কম্পিটিটিভ প্রোগ্রামিং ছেড়ে দিই। ফাইনাল ইয়ারে কেবল মেশিন লার্নিং নিয়েই পড়াশুনা করছিলাম। এই লম্বা গ্যাপের কারণে প্রব্লেম সলভিংয়ে ভালো করতে পারি নাই কয়েকটা ইন্টারভিউতে। আমি এখন যে কোম্পানিতে কাজ করি এটা ছাড়া আর কেউই আমার মেশিন লার্নিং কাজ করাটারে এপ্রিশিয়েট করছে বলে মনে হয় নাই। বলা যাইতে পারে ৩ বছরের কম্পিটিটিভ প্রোগ্রামিংয়ের মিডিওকোর পড়াশুনা দিয়েই সবকিছু করতে হয়েছে।

এযাবৎকালে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো প্রোগ্রামার তইরির পরিবেশ ছিলো না বা এখনো নাই বলেই ইন্ডাস্ট্রিতে আমাদের এমন নাজুক অবস্থা। এই মুহুর্তে বাংলাদেশে কম্পিটিটিভ প্রোগ্রামিং জোয়ার চলছে। আমাদের মতন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো ফার্মে চাকরি পেতে গেলে কম্পিটিটিভ প্রোগ্রামিং সবচে সহজ আর নির্ভরযোগ্য উপায় বলা যায়। এই লেখাটা যেহেতু ক্যাম্পাসের জুনিয়রদের জন্য তাই বলব মন দিয়ে এসিএম প্রোগ্রামিং করো। আমাদের সময়ে আমরা নিয়মিত ওয়ার্কশপ, কন্টেস্ট এগুলো দিয়ে একটা ন্যুনতম পরিবেশ তইরির চেষ্টা করছিলাম। আমাদের যাত্রা নিঃসন্দেহে কঠিন এবং আনওয়েলকামিং ছিল। ডিপ্রেসিংও বলা যায়। পরিস্থিতিতে যে খুব একটা বদলে গেছে এই আশা করি না অবশ্য। কিন্তু বাংলাদেশের প্রোগ্রামিং কম্যুনিটি এতোটাই শক্তিশালী যে চাইলে এই লড়াইটা একা একাই চালানো যায়। বিভাগের ক্লাব থেকে সেটা দারুণভাবে সম্ভব। আর পরিসংখ্যান বলে কম্পিটিটিভ প্রোগ্রামাররা সংখ্যায় কম হলেও গ্রাজুয়েট হিশেবে চাকরির বাজারে সবসময়ই ভালো কিছু করছে। এই নির্ভরতার জায়গায় আমি আরো অনেক জুনিয়রদের দেখতে পাই। ক্যাম্পাসে কম্পিটিটিভ প্রোগ্রামিং সংস্কৃতি যা দেখে আসছি বা ক্লাবের যা কিছু চর্চা ছিলো সেগুলো যদি নিয়মিত থাকে তাহলে দেশের প্রথম সারির সফটওয়্যার ফার্মে চাকরি পাওয়া আগামীর ফ্রেশারদের জন্য কোন ব্যাপারই না। এখন তো আমরা বাইরের বড় ফার্মগুলোতে চাকরি পাওয়া নিয়ে ভাবতে পারি।

আমার দল (মাজেদ, সুমন), ইয়াসিন কবির স্যার, কল্যাণ দা, মাশপি ভাই আর রায়হান ভাইকে ধন্যবাদ। এই আকাল চাকরির বাজারে খেয়েপরে থাকবার মতন মোটামুটি একটা চাকরি অবশ্য মিলছে। রায়হান ভাই সিভি ফরোয়ার্ড না করলে বর্তমান যেখানে কাজ করছি এখানে ইন্টারভিউ দেয়ার সুযোগই মিলত না। বড়ভাইদের যোগাযোগটা অনেক জরুরী কিছু কিছু ক্ষেত্রে। সঠিক তথ্য আর সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারাটা ক্যারিয়ারের জন্য জরুরী। আমার অবশ্য ভুল সিদ্ধান্ত নেবার প্রবণতা বেশি। আমাদের শক্তিশালী কম্যুনিটি গড়ে উঠুক এই প্রত্যাশা করি।